বিস্তারিত

কষ্টের ফেরিওয়ালা ও তারুণ্যের কবি হেলাল হাফিজের জন্মদিন আজ

কষ্ট, প্রেম, দ্রোহ, তারুণ্য ও যৌবনের প্রতীক কবি হেলাল হাফিজ। আধুনিক যুগের এই কবি তরুণদের কাছেই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

কবি হেলাল হাফিজের জন্ম ১৯৪৮ সালের আজকের এই দিনে। তাঁর কবিতা সংকলন ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর অসংখ্য সংস্করণ হয়েছে। কিন্তু ওই গ্রন্থটির ৩০টি সংস্করণ প্রকাশিত হলেও এরপর থেকে অনেক দিন ধরে গ্রন্থ প্রকাশে কবি ছিলেন একেবারেই নিরব। দীর্ঘ ২৬ বছরের নিরবতা ভেঙ্গে সর্বশেষ ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা একাত্তর’।

কবির প্রকাশিত কবিতা গুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’। এ কবিতার দুটি পংক্তি ‘‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’’ বাংলাদেশের কবিতামোদী ও সাধারণ পাঠকের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন গণআন্দোলনে কর্মীদের উজ্জীবিত করতে রাজনৈতিক নেতারা একে স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। কবির অন্যান্য কবিতা গুলো হল:

নিরাশ্রয় পাঁচটি আঙুল,দুঃসময়ে আমার যৌবন, অস্ত্র সমর্পণ, অগ্নুৎসব, বেদনা বোনের মতো, ইচ্ছে ছিলো, প্রতিমা, অন্যরকম সংসার, নিখুঁত স্ট্রাটেজি, আমার সকল আয়োজন, হিরণবালা, দুঃখের আরেক নাম, প্রত্যাবর্তন, তীর্থ, অনির্ণীত নারী, অশ্লীল সভ্যতা, কবিতার কসম খেলাম, পরানের পাখি, বাম হাত তোমাকে দিলাম, উপসংহার, শামুক, আমার কী এসে যাবে, ইদানীং জীবন যাপন, পৃথক পাহাড়, অহংকার, কোমল কংক্রিট, নাম ভূমিকায়, সম্প্রদান, একটি পতাকা পেলে, মানবানল, যার যেখানে জায়গা, কবি ও কবিতা, ফেরিঅলা, উৎসর্গ,যেভাবে সে এলো, রাডার, যাতায়াত, যুগল জীবনী, লাবণ্যের লতা, তোমাকেই চাই, ভূমিহীন কৃষকের গান, কবুতর, নেত্রকোনা, তুমি ডাক দিলে, হিজলতলীর সুখ, রাখাল, ব্যবধান, কে, অমীমাংসিত, সন্ধি, ক্যাকটাস, তৃষ্ণা, হৃদয়ের ঋণ, প্রস্থান, ঘরোয়া, রাজনীতি ও ডাকাত যার সবকটি পাঠকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

হেলাল হাফিজ সাংবাদিক ও সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কাজ করেছেন। অনেক আগেই কবি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য দাবিদার ছিলেন তার পরেও দেরীতে হলেও ২০১৩ সালে এসে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।

দেশের লক্ষ-কোটি তরুণদের উজ্জীবিত করা এই বরেণ্য কবি হেলাল হাফিজ ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম খোরশেদ আলী তালুকদার । আর মাতার নাম কোকিলা বেগম। ১৯৬৫ সালে নেত্রকোনা দত্ত হাইস্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন এরপরে ১৯৬৭ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে তিনি এইচএসসি পাস করে ওই বছরই কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ১৯৭২ সালে তিনি তৎকালীন জাতীয় সংবাদপত্র দৈনিক পূর্বদেশে সাংবাদিকতায় যোগদান করেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দৈনিক পূর্বদেশের সাহিত্য সম্পাদক। ১৯৭৬ সালের শেষ দিকে তিনি দৈনিক দেশ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক পদে যোগদান করেন । সর্বশেষ তিনি দৈনিক যুগান্তরে কর্মরত ছিলেন।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের রাতে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান কবি হেলাল হাফিজ। সে রাতে ফজলুল হক হলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পড়ে সেখানেই থেকে যান তিনি। রাতে নিজের হল ইকবাল হলে (বর্তমানে জহুরুল হক) থাকার কথা ছিল। সেখানে থাকলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার হতেন তারুণ্যের এই কবি। ২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেওয়ার পর ইকবাল হলে গিয়ে কবি দেখেন চারদিকে ধ্বংসস্তূপ এবং লাশ আর লাশ। হলের গেট দিয়ে বেরুতেই কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে দেখা। তাকে জীবিত দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে আবেগে বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকলেন নির্মলেন্দু গুণ। ক্র্যাকডাউনে হেলাল হাফিজের কী পরিণতি ঘটেছে তা জানবার জন্য সে দিন আজিমপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। পরে নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের দিকে আশ্রয়ের জন্য দুজনে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দেন।

Share on:
20 October,2019